Header Ads Widget

২০ রাকাত তারাবির ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি: একটি প্রামাণিক পর্যালোচনা


 

​ভূমিকা

​তারাবির নামাজ রমজান মাসের একটি বিশেষ ইবাদত। এর রাকাত সংখ্যা নিয়ে বর্তমান সময়ে কিছু মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও, ইসলামের সোনালী যুগ তথা সাহাবা ও তাবেয়ীদের আমল বিশ্লেষণ করলে ২০ রাকাতের ভিত্তি অত্যন্ত সুদৃঢ় ও অকাট্য প্রতীয়মান হয়। আমিরুল মুমিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালে সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে যে ২০ রাকাত তারাবির সূচনা হয়েছিল, তা পরবর্তী ১৪০০ বছর ধরে মক্কা ও মদিনার হারামাইনসহ মুসলিম উম্মাহর নিকট সর্বজনগ্রাহ্য আমল হিসেবে স্বীকৃত। এই প্রবন্ধে আমরা সায়িব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসসমূহের সূক্ষ্ম বিচার ও রাবিদের শক্তিমত্তা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করব।

​সায়িব ইবনে ইয়াজিদ (রা.)-এর বর্ণনা ও মূল রাবিগণ

​তারাবির রাকাত সংখ্যা সংক্রান্ত প্রধান হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে সাহাবী সায়িব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) থেকে। তাঁর থেকে এই হাদিসটি প্রধানত ৩ জন রাবি বর্ণনা করেছেন:

১. মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ (যিনি ১১, ১৩ এবং ২১ রাকাত বর্ণনা করেছেন)।

২. ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফা (যিনি একনিষ্ঠভাবে ২০ রাকাত বর্ণনা করেছেন)।

৩. আল-হারিস ইবনে আব্দুর রহমান (যিনি ২৩ রাকাত বর্ণনা করেছেন)।

​ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফার বর্ণনার শক্তিমত্তা

​২০ রাকাতের স্বপক্ষে সবচাইতে শক্তিশালী এবং সমালোচনা-মুক্ত দলিল হলো ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফার বর্ণনা। ইমাম বায়হাকি (রহ.) তাঁর ‘সুনানে কুবরা’-তে (হাদিস নং: ৪২৯৩) এই সনদটি উল্লেখ করেছেন:

​"ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফা থেকে বর্ণিত, তিনি সায়িব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: সাহাবায়ে কেরাম ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে রমজান মাসে ২০ রাকাত তারাবি পড়তেন।"

​এই সনদের বিশেষত্ব হলো, ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফা ইমাম বুখারি ও মুসলিমের নির্ভরযোগ্য (সিকাহ) রাবি। তাঁর থেকে এই ২০ রাকাতের তথ্যটি কোনো প্রকার ভিন্নতা ছাড়াই বর্ণনা করেছেন জগতবিখ্যাত ৪ জন ইমাম: সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, আবু দামরা আনাস ইবনে ইয়াদ, ইব্রাহিম ইবনে সাদ এবং স্বয়ং ইমাম মালিক (রহ.)। এই রাবিদের একনিষ্ঠতা প্রমাণ করে যে, ২০ রাকাতের বর্ণনাটি কোনো ভুল নয়, বরং এটিই ছিল তৎকালীন মদিনার প্রতিষ্ঠিত আমল।

​মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফের বর্ণনায় বৈচিত্র্য ও সমন্বয়

​অনেক গবেষক ১১ রাকাতের স্বপক্ষে মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফের বর্ণনা পেশ করেন। তবে গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফের ছাত্রদের মাঝে রাকাত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তাঁর ছাত্র ইমাম মালিক ১১ রাকাত বললেও, অন্য ছাত্র মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ১৩ রাকাত বলেছেন। পক্ষান্তরে, তাঁর অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ছাত্র দাউদ ইবনে কাইস (যিনি ইমাম মুসলিমের রাবি) মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফের সূত্রেই ২১ রাকাতের (২০ তারাবি + ১ বিতর) কথা বর্ণনা করেছেন (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা: ৭৬৮২)।

​মুহাদ্দিসগণের মতে, মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ যখন ওমর (রা.)-এর ‘আদেশের’ কথা বলতেন, তখন ১১ রাকাতের কথা আসত (যা ছিল দীর্ঘ কিরাতের জন্য শুরুর দিকের নির্দেশ)। কিন্তু যখন তিনি সাহাবীদের ‘বাস্তব আমলের’ কথা বলতেন, তখন ২০ বা ২১ রাকাতের কথা আসত। সুতরাং মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফের বর্ণনাও শেষ পর্যন্ত ২০ রাকাতের পক্ষেই জোরালো সাক্ষ্য দেয়।

​সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বা ঐকমত্য

​ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো ‘ইজমা’। ওমর (রা.) যখন ২০ রাকাত তারাবি চালু করেন, তখন মদিনায় শত শত সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। যদি ২০ রাকাত রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর পরিপন্থী হতো, তবে উসমান (রা.), আলী (রা.) বা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মতো ফকিহ সাহাবীরা অবশ্যই প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু ইতিহাসে এর কোনো প্রতিবাদ পাওয়া যায় না, বরং আলী (রা.) তাঁর খেলাফতকালেও ২০ রাকাতের আমল জারি রেখেছিলেন এবং একে নূর হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

বিশিষ্ট ইমাম ও ফকিহগণের ফতোয়া (ইক্বতিবাস)

​২০ রাকাত তারাবি যে কেবল একটি আমল নয়, বরং এটি উম্মতের নির্ভরযোগ্য ইমামদের নিকট সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ, তা নিচের উদ্ধৃতিগুলো থেকে স্পষ্ট হয়:

​১. ইমাম ইবনে আব্দুল বার (রহ.) (মৃত: ৪৬৩ হিজরি)

​মালেকি মাযহাবের এই শ্রেষ্ঠ ইমাম সায়িব ইবনে ইয়াজিদ (রা.)-এর হাদিস বিশ্লেষণ করে বলেন:

​"ওমর (রা.)-এর যুগে ২০ রাকাতের ওপর সাহাবীদের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটিই মদিনাবাসীদের আমল এবং জমহুর ওলামায়ে কেরামের নিকট অধিকতর বিশুদ্ধ।"

— সূত্র: আল-ইস্তযকার (খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৫৭)।


​২. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বক্তব্য (ইমাম কাসানি বর্ণিত)

​হানাফি মাযহাবের ইমামের অবস্থান সম্পর্কে ইমাম কাসানি (রহ.) বলেন:

​"নিশ্চয়ই ওমর (রা.) সাহাবায়ে কেরামকে উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর পেছনে একত্রিত করেছিলেন এবং তিনি ২০ রাকাত পড়িয়েছিলেন। সাহাবীদের মধ্য থেকে কেউ এর বিরোধিতা করেননি, যা এর ওপর ইজমা বা ঐকমত্য প্রমাণ করে।"

— সূত্র: বাদাউস সানায়ে (খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৮৮)।


​৩. ইমাম শাফেয়ি (রহ.) (মৃত: ২০৪ হিজরি)

​ইমাম শাফেয়ি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে বলেন:

​"আমি আমার শহর মক্কাবাসীদের দেখেছি তারা ২০ রাকাত তারাবি আদায় করে এবং মদিনাবাসীদের দেখেছি তারা ৩৬ রাকাত পড়ে। তবে ২০ রাকাতই আমার নিকট অধিক পছন্দনীয় এবং এটিই প্রশস্ত আমল।"

— সূত্র: কিতাবুল উম্ম (খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৬৭)।


​৪. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) (মৃত: ২৪১ হিজরি)

​হাম্বলি মাযহাবের ইমামের অভিমত সম্পর্কে বলা হয়েছে:

​"ইমাম আহমদ (রহ.)-এর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় মত হলো ২০ রাকাত। কারণ উবাই ইবনে কাব (রা.) ২০ রাকাত পড়াতেন এবং সাহাবীগণ তাঁর অনুসরণ করতেন। এটি সুন্নাহ ও ইজমার অন্তর্ভুক্ত।"

— সূত্র: আল-মুগনি (খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৬০৪)।


​৫. ইমাম নববী (রহ.) (মৃত: ৬৭৬ হিজরি)

​শাফেয়ি মাযহাবের প্রধান ফকিহ এবং বিখ্যাত মুহাদ্দিস বলেন:

​"আমাদের (শাফেয়ি) মাযহাবে তারাবি ২০ রাকাত এবং এটিই ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আহমদ এবং দাউদ জাহেরির মত। এটিই জমহুর ওলামার আমল।"

— সূত্র: আল-মাজমু' শারহুল মুহাজ্জাব (খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩২)।


​৬. শেখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) (মৃত: ৭২৮ হিজরি)

​তিনি এই রাকাত সংখ্যার সমন্বয় করে বলেন:

​"ওমর (রা.) যখন উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে মানুষের ইমামতি করতে বললেন, তখন তিনি ২০ রাকাত তারাবি এবং ৩ রাকাত বিতর পড়াতেন। এটিই অধিকাংশ ওলামার নিকট সুন্নাহ; কারণ এটি মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের উপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং কেউ এর প্রতিবাদ করেননি।"

— সূত্র: মাজমুউল ফাতাওয়া (খণ্ড: ২৩, পৃষ্ঠা: ১১২)।

​উপসংহার :

​পরিশেষে বলা যায়, ২০ রাকাত তারাবি কেবল একটি ঐতিহাসিক তথ্য নয়, বরং এটি সাহাবীদের সম্মিলিত আমল ও সুন্নতে খুলাফায়ে রাশেদিনের অংশ। ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফা এবং দাউদ ইবনে কাইস-এর মতো শক্তিশালী ও একনিষ্ঠ রাবিদের বর্ণনার বিপরীতে অন্য কোনো বিচ্ছিন্ন বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ফিকহ শাস্ত্রের ৪ জন ইমাম—ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)—সকলেই ২০ রাকাত বা তার বেশি তারাবিকে সুন্নাহ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অতএব, উম্মতের ঐক্যবদ্ধ আমল ও বিশুদ্ধ সনদের বিচারে ২০ রাকাত তারাবিই শরয়িভাবে সুদৃঢ়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ