Header Ads Widget

কওমি মাদরাসায় শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ,স্বাস্থ্য-সুরক্ষা কমিটিকে অবিলম্বে কার্যকরের নির্দেশ আল-হাইআতুল উলয়ার

 

Qawmi News 

নিউজ ডেস্ক:

দেশের ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও তাদের অধিভুক্ত সব মাদরাসার জন্য শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি করেছে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। একইসঙ্গে প্রতিটি মাদরাসায় ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান-এর নির্দেশে জারি করা এ নির্দেশনায় ইসলাহী ও তারবিয়াতি কার্যক্রম জোরদার, শিক্ষার্থী সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার মোকাবিলায় বিভিন্ন করণীয় তুলে ধরা হয়েছে।


সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের নির্যাতন এবং কতিপয় ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ ও অভিযোগ প্রকাশের প্রেক্ষাপটে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।


শাস্তির নামে প্রহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ


নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের শাসনের উদ্দেশ্য হতে হবে সংশোধন ও কল্যাণ, কোনোভাবেই প্রতিশোধ নয়। বিশেষ করে রাগের অবস্থায় কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


শাসনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথমে নম্রভাবে সতর্ক করা, প্রয়োজনে মৃদু ভর্ৎসনা ও ধমকের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে সর্বশেষ পর্যায়ে অভিভাবককে ডেকে বিষয়টি লিখিতভাবে অবহিত করে অভিভাবকের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


তবে কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীকে শাস্তিস্বরূপ প্রহার করা যাবে না বলে সুস্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।


লাঠি, বেত বা অন্য কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল, মাথা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা দাগ সৃষ্টি হতে পারে—এমন যেকোনো ধরনের শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।


এ ছাড়া প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, কটু ভাষা ব্যবহার, ঘৃণাসূচক উপনামে সম্বোধন এবং অন্য যেকোনো ধরনের মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণ থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


নির্দেশনা অমান্যকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়ত ও প্রচলিত বিধি—উভয় দৃষ্টিতে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলেও জানানো হয়েছে।


অপরাধের অভিযোগে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা


আল-হাইআতুল উলয়া নির্দেশনায় জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তার সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা হবে। অপরাধীকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় না দেওয়াই তাদের নীতি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


একইসঙ্গে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার ভিত্তিতে পুরো কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষকসমাজ ও শিক্ষার্থীদের প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের দায় সামগ্রিক কওমি অঙ্গনের ওপর চাপিয়ে দেওয়াকে যৌক্তিক নয় বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।


সাত দিনের মধ্যে তদন্তের নির্দেশ


প্রতিটি মাদরাসায় ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অসদাচরণ, নির্যাতন বা হয়রানির অভিযোগ থাকলে তা সুরক্ষা কমিটির কাছে পেশ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।


অভিযোগ পাওয়ার পর কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন পেশ করতে বলা হয়েছে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।


কোনো মাদরাসায় সুরক্ষা কমিটি না থাকা, কমিটি নিষ্ক্রিয় থাকা অথবা অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মাদরাসার ইলহাক স্থগিত বা বাতিলের কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।


ইসলাহী মজলিস ও অভিভাবক-সমাবেশ বাড়ানোর নির্দেশ


শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিটি মাদরাসায় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ইসলাহী মজলিস আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


এ ছাড়া নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিস এবং অভিভাবক-সমাবেশের আয়োজন বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।


এর মাধ্যমে অভিভাবকদের সঙ্গে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং শিক্ষার্থীদের কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত কর্তৃপক্ষের নজরে আনার ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


প্রতিটি বোর্ডে মনিটরিং সেল ও হটলাইন


মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার প্রতিরোধ ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকির জন্য প্রতিটি কওমি বোর্ডকে পৃথক মাদরাসা মনিটরিং সেল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক হটলাইন চালু করার কথাও বলা হয়েছে। কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর বোর্ড, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও সুরক্ষা কমিটিকে সমন্বিতভাবে তাৎক্ষণিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে।


শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রার্থীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


মিথ্যা অপবাদের ক্ষেত্রে আইনগত সহায়তা


মিথ্যা অপবাদ, ভিত্তিহীন সংবাদ বা মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার নিরপরাধ শিক্ষক, শিক্ষিকা, মুহতামিম বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বোর্ডগুলোর আইনজীবী প্যানেলের মাধ্যমে আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


প্রয়োজনে আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় হটলাইন ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ (হোয়াটসঅ্যাপ) নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে বলে নির্দেশনায় জানানো হয়েছে।


যেসব সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নির্দেশনা


নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আল-হাইআতুল উলয়ার স্থায়ী কমিটির ৬৯তম সভা এবং এর আগে ২৯ জুলাই ২০২৬ অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট সাবকমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এ নির্দেশনা প্রণয়ন করা হয়েছে।


নির্দেশনা প্রণয়নে হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী ও শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভীসহ উলামায়ে দেওবন্দের তালিম-তারবিয়তবিষয়ক রচনাবলি এবং প্রসিদ্ধ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানসমূহের ফতোয়ার অনুসরণ করা হয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।


আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় দেশের সব কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও তাদের অধিভুক্ত মাদরাসাগুলোকে বিষয়টি অবহিত করে অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ