ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্র ও শিক্ষকের সম্পর্ক হবে স্নেহ ও শ্রদ্ধার। বিশেষ করে নাবালেক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের শাসনের ক্ষেত্রে ইসলাম অত্যন্ত কঠোর এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রদান করেছে। ফক্বীহুল মিল্লাত মুফতী আবদুর রহমান রহ. বলতেন— "নাবালেক বাচ্চাদের প্রহার করলে রিজিক কমে যায়; কারণ তারা নিষ্পাপ।"
একজন আদর্শ শিক্ষকের জন্য এই বাক্যটি কেবল একটি উপদেশ নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা। নতুন এবং অভিজ্ঞ—উভয় স্তরের শিক্ষকদের জন্য শিশুদের শাসনের শরয়ী ও মানবিক সীমানা জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচে নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের মূল ইবারতসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. শাসনের মাধ্যম ও বয়সসীমা
দশ বছর বয়সের পর যদি কোনো শিশু নামাজ বা অতি জরুরি আদব শিখতে অবহেলা করে, তবে তাকে শাসনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই শাসন হতে হবে কেবল হাত দিয়ে, কোনো লাঠি বা শক্ত বস্তু দিয়ে নয়।
মূল ইবারত:
فى الدر المختار: وَإِنْ وَজَبَ ضَرْبُ ابْنِ عَشْرٍ عَلَيْهَا بِيَدٍ لَا بِخَشَبَةٍ لِحَدِيثِ مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعٍ।
(ফতোয়ায়ে দুররুল মুখতার)
ব্যাখ্যা: হাদীস শরীফে সাত বছর বয়সে নামাজের আদেশ দিতে বলা হয়েছে এবং দশ বছর বয়সে শাসনের কথা এসেছে। ফকীহগণ স্পষ্ট করেছেন যে, এই শাসন হতে হবে কেবল হাত দিয়ে, যাতে শিশু শারীরিকভাবে বড় কোনো আঘাত না পায়।
২. আঘাতের সংখ্যা ও আল্লাহর জবাবদিহিতা
শিক্ষক বা অভিভাবক কেউই শাসনের নামে যা ইচ্ছা তা করতে পারেন না। প্রহারের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে তিনটি।
মূল ইবারত:
وفى رد المحتار: قَوْلُهُ بِيَدٍ أَيْ وَلَا يُجَاوِزُ الثَّلَاثَ، وَكَذَلِكَ الْمُعَلِّمُ لَيْسَ لَهُ أَنْ يُجَاوِزَهَا قَالَ – عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ – لِمِرْدَاسٍ الْمُعَلِّمِ إيَّاكَ أَنْ تَضْرِبَ فَوْقَ الثَّلَاثِ، فَإِنَّك إذَا ضَرَبْت فَوْقَ الثَّلَاثِ اقْتَصَّ اللَّهُ مِنْك।
(ফতোয়ায়ে শামী)
রাসূলুল্লাহ (সা.) শিক্ষক মিরদাস (রা.)-কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন যে, তিনটির বেশি আঘাত করলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কাছ থেকে এর প্রতিশোধ নেবেন। অর্থাৎ, একজন শিক্ষককে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে তিনি কার ওপর হাত তুলছেন—আল্লাহর একজন নিষ্পাপ বান্দার ওপর।
৩. শিক্ষকের দায়িত্বের প্রকৃতি
শিক্ষক কোনো জেলখানাল রক্ষক নন, বরং তিনি পিতা-মাতার স্থলাভিষিক্ত একজন অভিভাবক।
মূল ইবারত:
أما المعلم فله ضربে، لأن المأمور يضربه نيابة عن الأب لمصلحته، والمعلم يضربه بحكم الملك بتمليك أبيه لمصلحة التعليم... لا يزيد على ثلاث ضربات।
(رد المحতার, ৯/৬১৬)
এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, শিক্ষক কেবল শিশুর কল্যাণের জন্যই শাসনের অধিকার পান। ব্যক্তিগত রাগ বা মেজাজ হারানোর কারণে প্রহার করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
৪. শিশুদের প্রতি কোমলতার যৌক্তিকতা
শিশুরা যেহেতু শরীয়তের দৃষ্টিতে দায়বদ্ধ (মুকাল্লাফ) নয়, তাই তাদের ওপর কঠোরতা করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
মূল ইবারত:
يجوز للمعلم أن يضربه بإذن أبيه نحو ثلاث ضربات ضربا وسطا سليما... لا بخشبة، فلأن الضرب بها ورد فى جناية صادرة عن المكلف ولا جناية عن الصغير।
(حاشية الطحطاوى على الدر المختار-১/১৭০)
মুকাল্লাফ বা প্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধের জন্য দণ্ডের বিধান রয়েছে, কিন্তু শিশুরা তো নিষ্পাপ। তাই তাদের ওপর বেত ব্যবহার করা শরীয়তের মেজাজ বহির্ভূত কাজ।
৫. সীমালঙ্ঘনের ভয়াবহ পরিণাম ও আইনি সতর্কতা
যদি কোনো শিক্ষক শিশুকে এমনভাবে আঘাত করেন যা হাড় ভেঙে দেয়, চামড়া ছিঁড়ে ফেলে বা রক্ত জমাট বাঁধিয়ে ফেলে, তবে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মূল ইবারত:
لو ضرب المعلم الصبى ضربا فاحشا قيد به، لأنه ليس له أن يضربها فى التاديب ضربا فاحشا وهو الذী يكسر العظم أو يخرق الجلد أو يسوده... وكذا المعلم إذا أدب الصبى فমাত منه يضمن عندنا।
(ফতোয়ায়ে শামী, ৬/১৩১)
যদি শিক্ষকের অতিরিক্ত শাসনের কারণে শিশুর মৃত্যু হয়, তবে শিক্ষককে এর জন্য দণ্ড বা দিয়ত দিতে হবে। শরীয়ত শিক্ষককে শাসনের অধিকার দিলেও জুলুমের অধিকার দেয়নি।
৬. শিক্ষকদের জন্য বিশেষ নসিহত ও কর্মপন্থা
বর্তমান সময়ে শাসন মানেই কেবল শারীরিক আঘাত নয়। আধুনিক শিশু মনোবিজ্ঞান এবং ইসলামী শিক্ষা পদ্ধতি আমাদের আরও অনেক বিকল্প শেখায়:
- স্নেহ ও মমতা: আগে শিশুর সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করুন। শিশু যখন শিক্ষককে ভালোবাসবে, তখন শিক্ষকের একটু মন খারাপই তার জন্য বড় শাস্তি হবে।
- বিচ্ছিন্নকরণ: সাময়িকভাবে কথা বলা বন্ধ রাখা বা তাকে ক্লাসের কোনো বিশেষ সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা।
- পুরস্কারের লোভ: ভালো কাজের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দিলে ভয়ের চেয়ে আগ্রহের কারণে তারা বেশি মনোযোগী হয়।
সারকথা ও চূড়ান্ত নীতিমালা:
১. অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রদের ক্ষেত্রে বেত বা লাঠির ব্যবহার চিরতরে বর্জন করতে হবে।
২. সর্বোচ্চ তিনটির বেশি আঘাত কোনোভাবেই করা যাবে না এবং তা হতে হবে কেবল হাত দিয়ে।
৩. শরীরের স্পর্শকাতর স্থান (মুখমণ্ডল, মাথা, বুক ও পেট) স্পর্শ করা সম্পূর্ণ হারাম।
৪. শাসনের সময় শিক্ষকের মনে যেন কোনো ক্ষোভ বা প্রতিশোধস্পৃহা না থাকে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল শিক্ষককে শিশুদের প্রতি রহমদিল হওয়ার এবং সুন্নাহ অনুযায়ী মানুষ গড়ার কারিগর হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

0 মন্তব্যসমূহ